৯০% মুসলমানের দেশে এত কুফুরি কেন? কবিরাজদের প্রতারণা
৯০% মুসলমানের দেশে এত কুফুরি কেন?
আমাদের প্রতিদিনের চলাফেরায় এমন অনেক দৃশ্য চোখে পড়ে, যেগুলো একজন সচেতন মুসলমানকে সত্যিই ভাবিয়ে তোলে। বাসের ভেতরে, রাস্তার মোড়ে, বিভিন্ন পিলারে, দেয়ালে কিংবা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই এমন সব বিজ্ঞাপন দেখা যায়, যেখানে কথিত কবিরাজরা মানুষের জীবনের প্রায় সব সমস্যার সমাধান করে দেওয়ার দাবি করে।
কারও দাবি স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া বন্ধ করে দিতে পারবেন। কারও দাবি হারানো ভালোবাসা ফিরিয়ে দিতে পারবেন। কেউ আবার ব্যবসায় উন্নতি, চাকরি পাওয়া, মামলা-মোকদ্দমায় জয়, শত্রুকে বশ করা, হারানো জিনিস খুঁজে দেওয়া কিংবা যেকোনো অসাধ্য সাধন করার নিশ্চয়তা দেন। বিজ্ঞাপনের ভাষা এমনভাবে সাজানো হয়, যেন তাদের হাতে মানুষের জীবনের সব সমস্যার চাবিকাঠি রয়েছে।
কিন্তু একজন মুসলমান হিসেবে আমাদের প্রথমেই প্রশ্ন করা উচিত মানুষের জীবনের এমন সব বিষয়ে এই ব্যক্তিদের কি সত্যিই কোনো ক্ষমতা আছে? আর যদি তারা এমন ক্ষমতার দাবি করে, তাহলে সেই ক্ষমতার উৎস কী?
সমস্যার সমাধানের প্রকৃত মালিক কে?
আমরা মুসলমান। আমাদের ঈমানের অন্যতম মৌলিক বিষয় হলো উপকার ও ক্ষতির প্রকৃত মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। তিনি চাইলে বিপদ দূর করতে পারেন, চাইলে অসুস্থতা থেকে শিফা দিতে পারেন, চাইলে রিজিক বাড়িয়ে দিতে পারেন এবং চাইলে এমন পরিস্থিতিরও সমাধান করতে পারেন, যা মানুষের কাছে একেবারেই অসম্ভব মনে হয়।
মানুষ অবশ্যই বিভিন্ন বৈধ উপায় অবলম্বন করবে। অসুস্থ হলে চিকিৎসকের কাছে যাবে, অর্থনৈতিক সমস্যায় পরিশ্রম করবে, পারিবারিক সমস্যা হলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করবে। কিন্তু এসব উপায় অবলম্বনের পাশাপাশি একজন মুমিনের অন্তরে বিশ্বাস থাকতে হবে ফলাফল দেওয়ার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর।
তাহলে যখন কেউ দাবি করে যে সে গোপন কোনো শক্তির মাধ্যমে মানুষের জীবনের অদৃশ্য বিষয় জানতে পারে, কারও ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে, কাউকে বশ করতে পারে কিংবা যেকোনো অসাধ্য সাধন করতে পারে তখন একজন মুসলমানের সতর্ক হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
কথিত কবিরাজদের বিজ্ঞাপনের আড়ালে কী আছে?
সব কবিরাজ বা চিকিৎসাপদ্ধতিকে একসঙ্গে একইভাবে দেখার প্রয়োজন নেই। বৈধ চিকিৎসা, ভেষজ চিকিৎসা কিংবা অভিজ্ঞ কোনো চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা আলাদা বিষয়। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন কেউ চিকিৎসার নামে এমন সব দাবি করতে শুরু করে, যার কোনো শরিয়তসম্মত ভিত্তি নেই এবং যেখানে গায়েবের খবর জানার দাবি, জিন-শয়তানের সাহায্য নেওয়া, তাবিজ-কবচ, অজানা মন্ত্র, শিরকী কর্মকাণ্ড কিংবা মানুষের ওপর অস্বাভাবিক ক্ষমতা প্রয়োগের দাবি থাকে।
অনেক সময় বিপদে পড়া মানুষ এসব বিষয় যাচাই না করেই তাদের কাছে ছুটে যায়। কেউ বছরের পর বছর অসুস্থ থাকার কারণে, কেউ সংসারে অশান্তির কারণে, কেউ ব্যবসায় ক্ষতির কারণে আবার কেউ সম্পর্কের সমস্যায় পড়ে শেষ পর্যন্ত এমন মানুষের কাছে যায়, যারা দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেয়।
বিপদে পড়া একজন মানুষ স্বাভাবিকভাবেই দ্রুত সমাধান চায়। আর এই দুর্বলতার সুযোগই নেয় প্রতারকরা।
তারা মানুষের ভয়কে কাজে লাগায়, সমস্যাকে আরও ভয়াবহ করে উপস্থাপন করে এবং এমনভাবে কথা বলে যে রোগী বা তার পরিবার মনে করতে শুরু করে এই ব্যক্তির কাছেই হয়তো একমাত্র সমাধান রয়েছে।
৯০% মুসলমানের দেশে এত প্রকাশ্যে এগুলো কীভাবে চলছে?
বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যক মানুষ মুসলমান। তারপরও প্রশ্ন থেকেই যায় এ ধরনের কর্মকাণ্ড এত প্রকাশ্যে প্রচার করা সম্ভব হচ্ছে কীভাবে?
আমার ধারণা মতে, এর অন্যতম বড় কারণ হলো চাহিদা। মানুষ যদি এসব কথিত কবিরাজের কাছে না যেত, তাদের বিজ্ঞাপন ও ব্যবসার এত বড় বাজার তৈরি হতো না।
আমাদের সমাজে অনেক মানুষ আছেন, যারা ধর্মীয় বিষয়ে খুব বেশি জানেন না। আবার এমন মানুষও আছেন, যারা ধর্মীয় কিছু জ্ঞান রাখেন; কিন্তু বিপদের সময় ভয়, হতাশা, লোভ কিংবা দ্রুত সমাধানের আকাঙ্ক্ষার কারণে সঠিক-বেঠিক যাচাই না করেই ভুল পথে চলে যান।
কেউ হয়তো বছরের পর বছর অসুস্থ। অনেক চিকিৎসা করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাননি। তখন কোনো একজন তাকে বলল, “অমুক কবিরাজের কাছে যান, তিনি সব ঠিক করে দিতে পারবেন।”
কেউ হয়তো সংসারে সমস্যায় আছেন। পরিচিত একজন বলল, “একজন আছেন, তিনি বশীকরণ করে দিতে পারেন।”
এভাবেই একজন মানুষ ধীরে ধীরে এমন একটি জায়গায় পৌঁছে যেতে পারেন, যেখানে তিনি বুঝতেই পারেন না সমস্যা সমাধানের আশায় তিনি আসলে কী ধরনের কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন।
অজ্ঞতা মানুষকে বড় বিপদের দিকে নিয়ে যেতে পারে
আমাদের সমাজে একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ অনেক মানুষ হারাম ও শিরকের বিষয়গুলো সম্পর্কে যথেষ্ট জানেন না।
তারা মনে করেন, “আমি তো শুধু সমস্যার সমাধান চাইছি।”
“আমি তো শুধু চিকিৎসা নিতে গিয়েছি।”
“আমি তো জানতাম না এটা করা যাবে না।”
কিন্তু কোনো কাজের ভয়াবহতা সম্পর্কে জানা না থাকলেও কাজটি সঠিক হয়ে যায় না। বরং এখানেই ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি।
একজন মুসলমানের উচিত অন্তত এতটুকু জ্ঞান অর্জন করা, যাতে তিনি বুঝতে পারেন কোনটি বৈধ চিকিৎসা, কোনটি শরিয়তসম্মত রুকইয়াহ এবং কোনটি এমন কর্মকাণ্ড, যা ঈমানের জন্য মারাত্মক হুমকি হতে পারে।
আলেম সমাজের দায়িত্ব
এখানে আলেম সমাজের দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মসজিদের মিম্বার থেকে, ওয়াজ মাহফিলের মঞ্চ থেকে, ইসলামি শিক্ষা কার্যক্রমে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং অন্যান্য বৈধ প্রচারমাধ্যমে এসব বিষয় নিয়ে আরও বেশি আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
মানুষকে শুধু বলা যথেষ্ট নয় যে, “কবিরাজের কাছে যাবেন না।” বরং কেন যাবেন না, কোন ধরনের কর্মকাণ্ড হারাম, কোন ধরনের বিষয় শিরক বা কুফুরির দিকে নিয়ে যেতে পারে, কীভাবে একজন সাধারণ মানুষ প্রতারককে চিনবে এবং বিপদে পড়লে তার করণীয় কী এসব বিষয়ও সহজ ভাষায় মানুষকে বোঝাতে হবে।
কারণ শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে অনেক সময় মানুষকে ফিরিয়ে আনা যায় না। তাকে সঠিক বিকল্পও দেখাতে হয়।
মানুষকে বোঝাতে হবে সমস্যা হলে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে, বৈধ চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে, প্রয়োজন হলে শরিয়তসম্মত রুকইয়াহ করতে হবে এবং কোনো অবস্থাতেই হারাম পদ্ধতিতে সমস্যার সমাধান খোঁজা যাবে না।
মন্দ কাজ দেখে নীরব থাকা কি যথেষ্ট?
মন্দ কাজ প্রতিরোধের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
“তোমাদের মধ্যে যে কেউ কোনো মন্দ কাজ দেখবে, সে যেন তা হাত দিয়ে পরিবর্তন করে; যদি তা না পারে, তবে মুখ দিয়ে; আর যদি তাও না পারে, তবে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করবে। আর সেটিই ঈমানের দুর্বলতম স্তর।”
(সহীহ মুসলিম)
এই হাদিস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সমাজে প্রকাশ্যে কোনো অন্যায় ছড়িয়ে পড়লে একজন মুসলমানেরও দায়িত্ব রয়েছে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করা।
অবশ্যই কোনো অন্যায় প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও শরিয়তের সীমারেখা ও প্রজ্ঞা বজায় রাখা জরুরি। কিন্তু নিজের চোখের সামনে মানুষকে ঈমানবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের দিকে যেতে দেখে সম্পূর্ণ উদাসীন থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
সাধারণ মুসলমানদের জন্য আমার কিছু পরামর্শ
আপনি যদি একজন সাধারণ মুসলমান হন এবং এসব বিষয়ে বিস্তারিত জ্ঞান না-ও থাকে, তবুও কিছু বিষয় মনে রাখতে পারেন।
আপনি যত বড় বিপদেই পড়ুন না কেন, যত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেই থাকুন না কেন কখনো এমন কারও কাছে যাবেন না, যে আপনাকে শরিয়তবিরোধী কোনো পদ্ধতিতে সমস্যার সমাধান দেওয়ার কথা বলে।
আপনার অসুস্থতা থাকলে চিকিৎসকের কাছে যান। প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কোনো অস্বাভাবিক সমস্যার ক্ষেত্রে শরিয়তসম্মত রুকইয়াহ গ্রহণ করতে পারেন। কিন্তু এমন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে যাবেন না, যারা অজানা মন্ত্র, শিরকী বাক্য, তাবিজ-কবচ, গায়েবের খবর, জিন হাজির করা, বশীকরণ বা এ ধরনের হারাম পদ্ধতির মাধ্যমে সমাধানের দাবি করে।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আল্লাহর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক শক্ত করুন।
নামাজ ঠিক করুন। নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করুন। সকাল-সন্ধ্যার মাসনূন যিকির ও দোয়া পড়ুন। বিপদে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে দোয়া করুন। বৈধ উপায় অবলম্বন করুন এবং ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করুন।
মনে রাখবেন, আপনার রব আপনাকে ভুলে যাননি
মানুষ যখন বিপদে পড়ে, তখন অনেক সময় মনে হয় “আমার আর কোনো পথ নেই।”
কিন্তু একজন মুমিনের জন্য পথ কখনো শেষ হয়ে যায় না। কারণ তার রব আছেন।
আপনি যে সমস্যার মধ্যে আছেন, সেটি হয়তো আপনার কাছে অনেক বড়। কিন্তু আল্লাহর কাছে তা অসম্ভব নয়। আপনি যে দরজায় সমাধান খুঁজছেন, সেটি হয়তো বন্ধ; কিন্তু আল্লাহ চাইলে এমন দরজা খুলে দিতে পারেন, যার কথা আপনি কল্পনাও করেননি।
তাই সমস্যার সময় প্রতারকের কাছে নয়, প্রথমে আপনার রবের কাছে ফিরে যান।
যিনি আপনাকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই আপনার সমস্যার সমাধানকারী।
নিজে সচেতন হোন। আপনার পরিবার-পরিজনকে সচেতন করুন। বন্ধু ও পরিচিতদের এসব বিষয়ে সতর্ক করুন। বিশেষ করে বিপদে পড়া মানুষ যেন দ্রুত সমাধানের আশায় প্রতারকদের হাতে না পড়ে সে বিষয়ে তাদের পাশে দাঁড়ান।
কোনো সমস্যার দ্রুত সমাধানের লোভে এমন কোনো পথে পা বাড়াবেন না, যার পরিণতি আপনার দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য ভয়াবহ হতে পারে।
কুফুরি ও শিরকী কর্মকাণ্ড থেকে নিজে দূরে থাকুন, অন্যকেও দূরে রাখার চেষ্টা করুন এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য বোঝার তাওফিক দিন, সব ধরনের শিরক ও কুফুরি থেকে হেফাজত করুন এবং বিপদের সময় একমাত্র তাঁর কাছেই সাহায্য চাওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
সম্পর্কিত আর্টিকেল
সমস্যায় আছেন?
আজই অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন বা আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।