জাদু ও সিহরআমল ও দুআরুকইয়াহ শারইয়্যাহ

জাদু থেকে বাঁচার উপায়: কুরআন-হাদিসের আলোকে গুরুত্বপূর্ণ আমল ও করণীয়

১০ আগস্ট, ২০২৬পড়তে ৪ মিনিট

জাদু একটি অদৃশ্য আগুনের মতো যার প্রভাব অনেক সময় মানুষের চোখের আড়ালে থেকে ধীরে ধীরে তার জীবনকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। মানুষের শারীরিক অবস্থা, মানসিক প্রশান্তি, পারিবারিক সম্পর্ক, দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড এমনকি ইবাদতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ইসলামের দৃষ্টিতে জাদুর অস্তিত্ব বাস্তব এবং কুরআন ও সহিহ হাদিসে এর ব্যাপারে সুস্পষ্ট আলোচনা রয়েছে।

জাদু কোনো স্বাভাবিক বা নিরীহ বিষয় নয়। ইসলামী শরিয়তে জাদু করা এবং জাদুর মাধ্যমে মানুষের ক্ষতি করার চেষ্টা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। জাদুকররা সাধারণত শয়তানের সাহায্য গ্রহণ করে এবং বিভিন্ন হারাম ও শিরকী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মানুষের ক্ষতি করার চেষ্টা করে। তাই একজন মুমিনের উচিত জাদু কিংবা এর অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য কোনো হারাম পদ্ধতি অবলম্বন না করে সরাসরি আল্লাহর কাছে আশ্রয় নেওয়া এবং কুরআন-হাদিসে বর্ণিত বৈধ আমল ও রুকইয়াহ শরইয়্যার মাধ্যমে প্রতিকার গ্রহণ করা।

জাদুর প্রভাব কীভাবে প্রকাশ পেতে পারে?

জাদুর প্রভাব ব্যক্তি ও পরিস্থিতিভেদে বিভিন্নভাবে প্রকাশ পেতে পারে। যেমন

  • অস্বাভাবিক শারীরিক অসুস্থতা বা দুর্বলতা;

  • স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অস্বাভাবিক বিরোধ ও সম্পর্কের অবনতি;

  • অতিরিক্ত অস্থিরতা বা মানসিক চাপ;

  • ঘুমের মধ্যে ভয়, অস্বস্তি বা বারবার দুঃস্বপ্ন দেখা;

  • কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই অস্বাভাবিক ভয় বা অস্থিরতা;

  • ইবাদত ও ভালো কাজের প্রতি অস্বাভাবিক অনীহা;

  • নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর মতো অনুভূতি;

  • দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজে অস্বাভাবিক প্রতিবন্ধকতা অনুভব করা।

তবে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এসব লক্ষণ দেখা দিলেই নিশ্চিতভাবে জাদু হয়েছে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। অনেক শারীরিক ও মানসিক সমস্যারও একই ধরনের লক্ষণ থাকতে পারে। তাই প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পাশাপাশি শরিয়তসম্মত রুকইয়াহ গ্রহণ করা উচিত। কোনো অসুস্থতাকে যাচাই-বাছাই ছাড়া জাদু বা জিনের সমস্যা হিসেবে ধরে নেওয়া সঠিক নয়।

জাদু থেকে বাঁচতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু আমল

জাদু ও শয়তানের অনিষ্ট থেকে আত্মরক্ষার জন্য একজন মুসলমানের জীবনে নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত, যিকির, দোয়া ও সুন্নাহসম্মত আমল থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

১. আয়াতুল কুরসি পাঠ করুন

সকাল-সন্ধ্যায় এবং বিশেষ করে ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি পাঠ করার অভ্যাস করুন। আল্লাহর কালামের মাধ্যমে তাঁর কাছে আশ্রয় চাওয়া একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমল।

২. সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পাঠ করুন

ঘুমানোর আগে সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস তিনবার করে পড়ে নিজের শরীরে ফুঁ দেওয়ার আমল করুন। সকাল-সন্ধ্যাতেও এসব সূরা পাঠ করার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

বিশেষ করে সূরা ফালাক ও সূরা নাসে বিভিন্ন ধরনের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়েছে। তাই এগুলো নিয়মিত পাঠ করা আত্মরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ আমল।

৩. প্রতিটি কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলুন

প্রতিটি বৈধ ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরু করার সময় “বিসমিল্লাহ” বলার অভ্যাস করুন। একজন মুসলমানের জীবনে বিসমিল্লাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহসম্মত অভ্যাস। আল্লাহর নাম স্মরণ করে কাজ শুরু করলে শয়তানের অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।

৪. ঘরে সূরা বাকারাহ তিলাওয়াত করুন

বাড়ির পরিবেশে নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াতের অভ্যাস করুন। বিশেষ করে সূরা বাকারাহ তিলাওয়াত করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। সহিহ হাদিসে সূরা বাকারাহ পাঠের মাধ্যমে ঘরকে শয়তানের অনিষ্ট থেকে সুরক্ষিত রাখার বিষয়টি এসেছে।

তাই সম্ভব হলে পরিবারের সদস্যরা নিজেরাই সূরা বাকারাহ তিলাওয়াত করুন এবং ঘরে কুরআনের শিক্ষা ও আমলের পরিবেশ তৈরি করুন।

৫. সকাল-সন্ধ্যার গুরুত্বপূর্ণ দোয়া পড়ুন

প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় অন্তত তিনবার নিম্নের দোয়াটি পাঠ করুন

بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ

অর্থ:
“আল্লাহর নামে শুরু করছি, যার নামের সঙ্গে থাকলে আকাশ ও জমিনের কোনো কিছুই ক্ষতি করতে পারে না। আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।”

(সুনান আত-তিরমিজি: ৩৩৮৮)

এই দোয়াটি সকাল-সন্ধ্যায় নিয়মিত পাঠ করার অভ্যাস করুন এবং অন্তর থেকে আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা ও হেফাজত প্রার্থনা করুন।

বিপদে পড়ে কবিরাজ বা জাদুকরের কাছে যাবেন না

জাদু বা অস্বাভাবিক কোনো সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা করলে অনেক মানুষ দ্রুত সমাধানের আশায় কথিত কবিরাজ, গণক, জাদুকর কিংবা তান্ত্রিকের কাছে ছুটে যান। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক।

কেউ যদি জাদুর চিকিৎসার নামে অজানা তাবিজ, মন্ত্র, অদ্ভুত কাগজ, শিরকী বাক্য, জিন হাজির করা, গণনা করা কিংবা শরিয়তবিরোধী কোনো পদ্ধতি ব্যবহার করে, তাহলে তার কাছ থেকে দূরে থাকুন।

মনে রাখবেন, জাদুর ক্ষতি থেকে বাঁচতে গিয়ে এমন কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করা যাবে না, যা নিজেই হারাম বা শিরকের দিকে নিয়ে যায়। একজন মুমিনের বিশ্বাস হওয়া উচিত যে উপকার ও ক্ষতির প্রকৃত মালিক একমাত্র আল্লাহ।

রুকইয়াহ শরইয়্যাহ গ্রহণ করুন

জাদু, বদনজর, শয়তানের অনিষ্ট বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক সমস্যার আশঙ্কা থাকলে কুরআন ও সহিহ হাদিসের দোয়া-আমলের মাধ্যমে রুকইয়াহ শরইয়াহ করা যেতে পারে।

রুকইয়াহর ক্ষেত্রে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যে তা কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম-গুণাবলি এবং সহিহভাবে বর্ণিত দোয়ার মাধ্যমে হতে হবে এবং এতে কোনো শিরকী বা হারাম বিষয় থাকা যাবে না।

তবে কোনো ব্যক্তি অসুস্থ হলে শুধুমাত্র জাদুর আশঙ্কা করে চিকিৎসা বন্ধ করে দেওয়া উচিত নয়। শারীরিক বা মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণের পাশাপাশি শরিয়তসম্মত রুকইয়াহ করা যেতে পারে।

সময় থাকতে সচেতন হোন

জাদুর অনিষ্ট অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে। তাই নিজের ও পরিবারের ঈমানি নিরাপত্তার জন্য নিয়মিত নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, সকাল-সন্ধ্যার মাসনূন যিকির এবং অন্যান্য সুন্নাহসম্মত আমলকে জীবনের অংশ করে নিন।

শুধু বিপদে পড়ার পর আমল শুরু না করে সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থাতেও নিয়মিত আল্লাহকে স্মরণ করুন। সন্তানদেরও ছোটবেলা থেকেই দোয়া, যিকির ও কুরআনের শিক্ষা দিন।

মনে রাখবেন, আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল, নিয়মিত ইবাদত এবং কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা মেনে চলাই একজন মুমিনের সর্বোত্তম আত্মরক্ষার পথ।

যদি কোনো ব্যক্তির শারীরিক বা মানসিক সমস্যা গুরুতর হয়, তাহলে বিষয়টিকে অবহেলা না করে যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। পাশাপাশি জাদু, বদনজর বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক সমস্যার আশঙ্কা থাকলে অভিজ্ঞ ও শরিয়তসম্মত রুকইয়াহ বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিতে পারেন।

লাব্বাইক রুকইয়াহ সেন্টার কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে শরিয়তসম্মত রুকইয়াহ সেবার মাধ্যমে আপনার পাশে থাকার চেষ্টা করে। প্রয়োজন হলে আমাদের পেজে ইনবক্স করে যোগাযোগ করতে পারেন।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শয়তান, জাদু, বদনজর এবং যাবতীয় অনিষ্ট থেকে হেফাজত করুন এবং কুরআন ও সুন্নাহর ওপর অটল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

শেয়ার করুন:WhatsAppFacebook

সম্পর্কিত আর্টিকেল

সমস্যায় আছেন?

আজই অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন বা আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।