ইসলামিক সেবা

শয়তানের ভয় নয়, আল্লাহর ওপর ভরসাই মুমিনের শক্তি

১১ আগস্ট, ২০২৬পড়তে ৪ মিনিট

মানুষের জীবনে ভয়, দুশ্চিন্তা, অনিশ্চয়তা ও নানা ধরনের বিপদ আসতেই পারে। কখনো বাস্তব কোনো সমস্যা আমাদের চিন্তিত করে, আবার কখনো অকারণ ভয়, সন্দেহ ও হতাশা আমাদের মনকে দুর্বল করে দেয়। একজন মুমিনের জন্য এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সে যেন ভুলে না যায় যে তার জীবনের প্রকৃত অভিভাবক ও সাহায্যকারী একমাত্র আল্লাহ তাআলা।

শয়তান মানুষের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তাকে ভয় দেখাতে এবং সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চেষ্টা করে। সে মানুষের মনে কুমন্ত্রণা সৃষ্টি করে, পাপকে আকর্ষণীয় করে দেখায়, ভালো কাজ থেকে বিরত রাখে এবং কখনো কখনো মানুষকে এমন ভয় ও হতাশার মধ্যে ফেলে দেয় যে সে আল্লাহর রহমত সম্পর্কেই নিরাশ হয়ে পড়ে।

কিন্তু একজন মুমিনের উচিত এসব কুমন্ত্রণার কাছে পরাজিত না হওয়া। কারণ শয়তানের ভয় যত বড়ই মনে হোক, আল্লাহর ক্ষমতা তার চেয়ে অসীমভাবে বড়।

আল্লাহই মুমিনের অভিভাবক

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:

اللَّهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُوا يُخْرِجُهُمْ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ

“আল্লাহ মুমিনদের অভিভাবক। তিনি তাদের অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন।”

সূরা আল-বাকারা: ২৫৭

এই আয়াত একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত বড় আশ্বাস। মানুষ যখন কোনো বিপদে পড়ে, তখন তার মনে হতে পারে সে একা, তার সামনে কোনো পথ নেই, পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় নেই। কিন্তু ঈমানদারের জন্য বাস্তবতা ভিন্ন।

আল্লাহ তার অভিভাবক।

অন্ধকার যত গভীরই হোক, আল্লাহ চাইলে সেখান থেকে আলোতে বের করে আনতে পারেন। সমস্যা যত জটিলই হোক, আল্লাহ চাইলে তার সমাধানের পথ খুলে দিতে পারেন। তাই বিপদের সময় একজন মুমিনের প্রথম আশ্রয় হওয়া উচিত তার রবের কাছে ফিরে যাওয়া।

শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে সতর্ক থাকা

শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। সে মানুষকে সরাসরি বাধ্য করতে পারে না, বরং কুমন্ত্রণা, প্ররোচনা ও প্রতারণার মাধ্যমে তাকে ভুল পথে নেওয়ার চেষ্টা করে।

কখনো সে বলে, “তোমার আর কোনো উপায় নেই।”

কখনো বলে, “তোমার সমস্যা আর কখনো ঠিক হবে না।”

কখনো মানুষকে পাপের দিকে ঠেলে দেয় এবং পরে তাকে হতাশ করে বলে, “তোমার আর ক্ষমা পাওয়ার সুযোগ নেই।”

এগুলো শয়তানের অন্যতম কৌশল। একজন মুমিনকে বুঝতে হবে, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না এবং শয়তানের কোনো কুমন্ত্রণাকে সত্য ধরে নেওয়া যাবে না।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

إِنَّهُۥ لَيْسَ لَهُۥ سُلْطَٰنٌ عَلَى ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ وَعَلَىٰ رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ

“নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের রবের ওপর ভরসা করে, তাদের ওপর তার কোনো কর্তৃত্ব নেই।”

সূরা আন-নাহল: ৯৯

এর পরের আয়াতে আল্লাহ শয়তানের কর্তৃত্ব কার ওপর হয় সে বিষয়েও সতর্ক করেছেন। তাই এখানে বিষয়টি শুধু ভয় না পাওয়ার নয়; বরং ঈমান ও তাওয়াক্কুলের সঙ্গে নিজেকে আল্লাহর আনুগত্যে দৃঢ় রাখার বিষয়।

তাওয়াক্কুল মানে সমস্যাকে অস্বীকার করা নয়

আল্লাহর ওপর ভরসা করার অর্থ এই নয় যে মানুষ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করবে না বা বিপদ থেকে বের হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় চেষ্টা করবে না।

বরং তাওয়াক্কুল হলো প্রয়োজনীয় বৈধ চেষ্টা করার পর ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর নির্ভর করা।

অসুস্থ হলে চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। বিপদে পড়লে বৈধ উপায়ে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। অন্যায় থেকে বাঁচতে সতর্ক হতে হবে। একই সঙ্গে অন্তরে বিশ্বাস রাখতে হবে যে চূড়ান্ত ফলাফল আল্লাহর হাতে।

এই ভারসাম্য একজন মুমিনকে একদিকে দায়িত্বশীল করে, অন্যদিকে অতিরিক্ত ভয় ও হতাশা থেকে রক্ষা করে।

ভয় এলে আল্লাহর দিকে ফিরে আসুন

ভয় বা কুমন্ত্রণা অনুভব হলে প্রথম কাজ হওয়া উচিত আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া। কুরআন তিলাওয়াত, সালাত, যিকির, দোয়া এবং আল্লাহর স্মরণ একজন মুমিনের অন্তরকে দৃঢ় রাখতে সাহায্য করে।

শয়তান মানুষকে যত বেশি আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে রাখতে চায়, মুমিনের উচিত তত বেশি নিজের রবের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করা।

শুধু মুখে আল্লাহর ওপর ভরসা করার কথা বললেই যথেষ্ট নয়। বরং জীবনের সিদ্ধান্ত, বিপদ, ভয়, দুশ্চিন্তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের সময়ও আল্লাহর ওপর নির্ভর করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

ভয়কে ঈমানের শক্তিতে পরিণত করুন

জীবনে ভয় আসবে। বিপদ আসবে। কখনো এমন পরিস্থিতিও আসতে পারে যখন চারপাশের সব পথ বন্ধ মনে হবে।

কিন্তু একজন মুমিনের শক্তি হলো, সে জানে তার রব তাকে দেখছেন।

সে জানে, তার কষ্ট আল্লাহর অজানা নয়।

সে জানে, মানুষের ক্ষমতা সীমিত হলেও আল্লাহর ক্ষমতার কোনো সীমা নেই।

তাই কোনো ভয়কে নিজের ঈমানের চেয়ে বড় হতে দেওয়া উচিত নয়।

যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর নির্ভর করতে শেখে, সে বিপদের মধ্যেও আশা ধরে রাখতে পারে। কারণ তার বিশ্বাস থাকে, আল্লাহ চাইলে সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিও পরিবর্তন করে দিতে পারেন।

শয়তানের ভয় থেকে মুক্তির পথ

শয়তানের কুমন্ত্রণা ও ভয় থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য একজন মুমিনের উচিত:

  • ঈমান ও তাওহীদের ওপর দৃঢ় থাকা।

  • পাঁচ ওয়াক্ত সালাত যথাযথভাবে আদায় করা।

  • নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করা।

  • আল্লাহর যিকির ও দোয়া বজায় রাখা।

  • গুনাহ থেকে নিজেকে দূরে রাখা।

  • শয়তানের কুমন্ত্রণা এলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া।

  • আল্লাহর রহমত থেকে কখনো নিরাশ না হওয়া।

  • বিপদের সময় বৈধ উপায়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

  • ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করা।

মনে রাখতে হবে, শয়তানের সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য হলো মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া। তাই ভয় পেয়ে আল্লাহ থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়; বরং ভয় ও বিপদের সময় আরও বেশি করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসাই মুমিনের পথ।

শেষ কথা

শয়তান মানুষকে ভয় দেখাতে পারে, কুমন্ত্রণা দিতে পারে এবং ভুল পথে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু একজন মুমিনের জীবনের নিয়ন্ত্রণ শয়তানের হাতে নয়।

আল্লাহ তাআলা মুমিনদের অভিভাবক। তিনি তাদের অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসেন। আর যারা ঈমান আনে এবং তাদের রবের ওপর ভরসা করে, তাদের ওপর শয়তানের কর্তৃত্ব নেই।

তাই ভয়কে নিজের ওপর প্রাধান্য না দিয়ে ঈমানকে শক্তিশালী করুন। আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করুন। তাঁর কাছে সাহায্য চান এবং বৈধ উপায়ে নিজের দায়িত্ব পালন করুন।

ভয় নয়, তাওয়াক্কুল।
হতাশা নয়, আল্লাহর রহমতের আশা।
শয়তানের কুমন্ত্রণা নয়, আল্লাহর নির্দেশনাই হোক আমাদের পথ।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে হেফাজত করুন, ঈমানকে দৃঢ় রাখুন এবং জীবনের সকল বিপদে তাঁর ওপর সত্যিকারের তাওয়াক্কুল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

শেয়ার করুন:WhatsAppFacebook

সম্পর্কিত আর্টিকেল

সমস্যায় আছেন?

আজই অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন বা আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।